CES-২০১৯ এ দেখানো ভবিষ্যতের গাড়ি

আলো ঝলমলে শহর লাস ভেগাসে গত ৮ জানুয়ারী শুরু হয়ে ১১ই জানুয়ারি পর্দা নামলো প্রযুক্তিপ্রেমীদের অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত ও প্রযুক্তি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উৎসব CES বা Consumer Electronic Show এর। লাস ভেগাস কনভেনশন সেন্টারকে সেই তিনদিন কেউ সাই-ফাই মুভির একটা সেট বললে মোটেও বকা দেয়া যেত না তাকে। কারণ, তিনদিন ব্যাপী চলা এই উৎসবে দেখানো হয়েছিল গুটিয়ে রাখা টিভি থেকে শুরু করে আপগ্রেডেবল ল্যাপটপ হয়ে কোয়াডরোটর ট্যাক্সি পর্যন্ত বেশকিছু নতুন এবং বিস্ময়কর প্রযুক্তি পণ্য।

আমি নিজে একজন গাড়িপ্রেমী হওয়ায় CES এ দেখানো গাড়িগুলোর দিকেই বেশী নজর ছিলো। বেশ কয়েকবছর ধরে প্রযুক্তি জগতে তর্ক-বিতর্কের উদ্রেক ঘটানো চালক বিহীন গাড়ি বা Autonomous Car এর ক্ষেত্রে বেশকিছু অভাবনীয় উন্নতি দেখা গিয়েছে। যাত্রীর সর্বোচ্চ আরাম এবং নিরবিচ্ছিন্ন সুবিধা নিশ্চিতকারী চালকবিহীন গাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছিল বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতারা।

দেখা যাক তারা কি কি দেখিয়েছে CES 2019 এ-

Nissan IMx Kuro: এটি হচ্ছে সম্পূর্ণ চালকবিহীন এবং দূষণমুক্ত ক্রসওভার গাড়ির কনসেপ্ট (ক্রসওভারঃ এসইউভির মত সুবিধাযুক্ত কিন্তু প্যাসেঞ্জার কারের মুলনীতির ওপর ভিত্তি করে বানানো গাড়ি) যা ২০২০ সাল নাগাদ বাজারে পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। Kuro’র বাইরের দিকটা দেখতে সাধারণ গাড়ির মত হলেও ভেতরে ড্যাশবোর্ডে রয়েছে প্যানারমিক OLED ডিসপ্লে এবং দরজার ভেতরের অংশে দেয়া হয়েছে কাঠের গুড়োর মত সুন্দর ফিনিশিং।

Audi Aicon: ২০১৭ সালে প্রথম লোকচক্ষূর সামনে আনা হয়েছিল এই চালকবিহীন বাহনটিকে। ২০২১ সালে প্রস্তুতকর্ম শুরু করতে যাওয়া এই কনসেপ্ট কারটিতে রয়েছে চারটি মোটর এবং একবারের চার্জে চলবে প্রায় ৪৩৫ থেকে ৪৯৭ মাইল পর্যন্ত। আউডি’র সূত্রমতে ৩০ মিনিটেরও কমসময়ে তারবিহীনভাবে প্রায় ৮০ ভাগ চার্জ সম্পন্ন করতে সক্ষম এই গাড়িটি। স্বচ্ছ ছাদের এই বিলাসবহুল গাড়িতে নেই কোন অ্যাক্সিলারেটর প্যাডেল। এমনকি নেই কোন ব্রেক প্যাডেল বা কোন স্টিয়ারিং হুইল যা স্বপ্ন দেখায় সম্পূর্ণ চালকবিহীন এক ভবিষ্যতের।

Mitsubishi Emirai 4: ২০১৭ সালে সর্বপ্রথম মুক্তি পাওয়া এই গাড়িটি দেখলে মনে হবে যেন কোন X-men মুভি থেকে বেরিয়ে এসেছে। এই গাড়িটি চালকবিহীন এমনকি চালকের সাহায্যেও চালানো যাবে। এই কনসেপ্ট গাড়িটিতে যুক্ত করা হয়েছে 3D mapping সমৃদ্ধ Augmented Reality যার সাহায্যে চালক এবং যাত্রী বাইরের পরিবেশের পরিষ্কার ত্রিমাত্রিক চিত্র দেখতে পাবেন ভেতরের এলসিডি প্যানেলে। এছাড়া অন্যান্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে মোবাইল পেমেন্ট এবং বায়োমেট্রিক নিরাপত্তার সুবিধা। Smart home প্রযুক্তির সুবিধা থাকায় গাড়িতে বসে ঘর থেকে দূরে থেকেও ঘরের বেশকিছু ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

BMW Vision iNext: এই গাড়িটিকে বলা যায় সায়েন্স ফিকশন মুভি থেকে বেরিয়ে আসা একটা চলন্ত বসার ঘর। চালকবিহীন এই বৈদ্যুতিক বিলাসবহুল গাড়িটিতে রয়েছে কাঠ এবং চামড়ার তৈরি আবরণের নিচে লুকিয়ে রাখা স্পর্শকাতর স্ক্রিন এবং গাড়ির ভেতরে যেকোন স্থানে স্ক্রিন প্রজেকশনের ব্যবস্থা সাথে রয়েছে Intelligent voice assistant এর সহযোগীতা। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন এই গাড়িতে চড়ে কোনরকম চিন্তা ছাড়াই আরাম করে ভয়েস অ্যাসিসট্যান্ট আর স্পর্শকাতর স্মার্ট কফি টেবিল পাশে রেখে গল্প করতে করতে ঘুড়ে বেড়ানো যাবে।

Waymo one: Google এর self-driving প্রজেক্টের অধীনে থাকা Waymo ২০১৬ সালে আলাদা হয়ে Alphabet Inc. এর সাবসিডিয়ারি প্রজেক্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এই বছরের CES এ তারা প্রদর্শন করে Waymo One নামের মিনিভ্যানের কনসেপ্টটি। পারিপার্শ্বিক অবস্থা সঠিকভাবে বোঝার জন্য এতে রয়েছে Lidar arrays এবং ছাতে বসানো রয়েছে ক্যামেরা। (LIDAR: Light Detection And Ranging যা Radar এর মূলনীতি অনুসরণ করে বানানো হলেও কাজ করে লেজার ব্যবহার করে)। Waymo বাণিজ্যিকভাবে কাজ শুরু করার আগে প্রায় শ’খানেক মানুষকে পরীক্ষামূলক যাত্রার জন্য আহবান জানিয়েছে।

Mercedes-Benz CLA: CES ২০১৯ এ দেখানো সব গাড়ির মধ্যে আমার কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি যুগোপযোগী বা কেনার মত মনে হয়েছে তা হচ্ছে 2020 Mercedes-Benz CLA. দ্বিতীয় প্রজন্মের এই ক্যুপ(ক্যুপঃ ছোট আকারের প্যাসেঞ্জার কার) এ রয়েছে Hands-free মোড সমৃদ্ধ Semi-autonomous ড্রাইভিং সিস্টেম। গাড়িটিতে জুড়ে দেয়া হয়েছে মার্সেডিজ এর নিজস্ব আবিষ্কার MBUX voice control যার সাহায্যে যাত্রী গাড়ীর শীতাতপ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য শপিং মল বা দোকানের ঠিকানা প্রদর্শন এমনকি যাত্রীর মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে যাওয়ার মত বিভিন্ন স্থানের সাজেশনও দিতে পারবে। মার্সেডিজ ব্র্যান্ডেড স্মার্টওয়াচ Vivoactive Germin 3 এর সাথে সংযুক্ত করেও বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে এই গাড়িটিতে। গাড়িটি এই বছরের শেষদিক বাজারে পাওয়া যাবে বলে জানা গিয়েছে।

Mercedes-Benz Vision Urbanetic:  গাড়িকে আপগ্রেড করে থেমে থাকেনি অটোমোটিভ জগতের বিগ বয় মার্সেডিজ। Vision Urbanetic নামের একটি মিনিবাসের কনসেপ্ট প্রদর্শন করেছে তারা এবারের CES এ। ট্রন মুভির গাড়িগুলোর মত দেখতে সম্পূর্ণ চালকবিহীন এই মিনিবাসটি মূলত বানানো হয়েছে রাইড শেয়ারিং ট্যাক্সি হিসেবে ব্যবহার অথবা মালামাল পরিবহনের জন্য।

Nvidia Drive Autopilot: ২০১৯ সালের CES এ বিখ্যাত গ্রাফিক্স কার্ড নির্মাতা Nvidia প্রকাশ করেছে তাদের নতুন অটোমোটিভ হার্ডওয়্যার ‘Xavier’. গাড়ির ট্রাঙ্কে এই ড্রাইভ অটোপাইলট হার্ডওয়্যার স্থাপন করে পাওয়া যাবে দ্বিতীয় পর্যায়ের অটোনমি। অর্থাৎ ড্রাইভার অ্যাক্সিলারেশন, ব্রেকিং এবং স্টিয়ারিং এর ক্ষেত্রে Xavier এর সাহায্য পাবে।

2020 Lincoln Aviator: ৪৫০ অশ্বশক্তির টুইন টার্বোচার্জড V6 এঞ্জিন সমৃদ্ধ এই হাইব্রিড ক্রসওভার গাড়িটিতে রয়েছে বেশকিছু সুবিধা। যাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কোন চাবি ছাড়াই শুধুমাত্র স্মার্টফোনের সাহায্যে লক/ আনলক করার সুবিধা। এছাড়াও জ্যাম অ্যাসিস্ট,পার্কিং অ্যাসিস্ট এবং অ্যাডাপটিভ সাসপেনশন (প্রয়োজন অনুযায়ী গাড়ির সাসপেনশন দৃঢ় বা নমনীয় করা যাবে) এর মতো সুবিধা রয়েছে। এছাড়া ম্যানুয়াল কন্ট্রোলে কিছু অটোম্যাটিক কন্ট্রোলের অনুভূতি যোগ করবে Conserve এবং Excite মোড। সঙ্গীত প্রেমীদের জন্য গাড়িটিতে থাকছে 28-speaker Revel Ultima 3D audio system.

Byton M-Byte and K-Byte: এ বছর প্রস্তুতকাজ শুরু হতে যাওয়া বিলাসবহুল SUV এর সকল সুবিধা সমৃদ্ধ Byton M-Byte প্রায় সম্পূর্ণ ড্যাশবোর্ড জুড়ে রয়েছে ৪৮ ইঞ্চি আকারের টাচস্ক্রিন প্যানেল। এছাড়া স্টিয়ারিং হুইলে রয়েছে ছোট্ট আরেকটি টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে এবং বাইরে রয়েছে বেশকিছু ক্যামেরা যা সাহায্য করবে অটোনমাস ড্রাইভিং এ। ২০২১ সালে বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকাজ শুরু হতে যাচ্ছে Byton K-Byton নামের প্রিমিয়াম সেডানটি’র। যাতে আছে ৪র্থ পর্যায়ের অটোনমাস ড্রাইভিং সিস্টেম, যার মানে হচ্ছে মানুষের কোনরকম সাহায্য ছাড়াই চলতে পারবে গাড়িটি। M-Byte এর মতো K-Byte এ ও রয়েছে ড্যাশবোর্ড জুড়ে বিশাল টাচস্ক্রিন ডিসপ্লে। গাড়িটির চালকবিহীন মোড বন্ধ অবস্থায় তার পাশের ‘LiGuard’ সেন্সরগুলো গাড়ির ভেতরের দিকে ঢুকিয়ে রাখা যায়। দুটি গাড়িতেই Byton OS এর সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে Amzon Alexa.

Harley-Davidson LiveWire: বিশ্বখ্যাত মোটরবাইক নির্মাতা হার্লে-ডেভিডসন এবার বাজারে এনেছে তাদের প্রথম বৈদ্যুতিক মোটরবাইক। বিল্ট-ইন GPS, 4G LTE, ড্যাশবোর্ডে LCD স্ক্রিন এবং গান শোনার সুবিধাযুক্ত এই মোটরবাইক তৈরি করতে সাহায্য করেছে প্যানাসনিক অটোমোটিভ। বাইকটি মাত্র সাড়ে তিন সেকেন্ডে ৬০ মাইল/ঘন্টা গতি তুলতে সক্ষম। প্রতি বারের চার্জে প্রায় ১১০ মাইল চলতে সক্ষম এই বাইক।

এছাড়া CES এ দেখানো হয়েছিলো নতুন ধরণের কিছু যানবাহন যাদের মধ্যে রয়েছেঃ

Hyundai Elevate: অনেকটা রিয়েল লাইফের ট্রান্সফর্মার বলা যায় এই গাড়িটিকে। গাড়িটি তার সামনে পড়া ৫ফিট তার ছোট কোন বাঁধা দেখলে তার চাকার পেছনে ভাঁজ করে লুকিয়ে রাখা রোবটিক-পা বের করে তা ব্যবহার করে ঐ বাঁধা পার হয়ে যেতে পারে।

Bell Nexus Air Taxi: ড্রোন এবং হেলিকপ্টার এর হাইব্রিড এই অদ্ভূত বাহনটিকে আনা হয়েছিলো এবারের CES এ। ১৫০ মাইল রেইঞ্জ সমৃদ্ধ এই আকাশযানটি বর্তমানে ডালাস, দুবাই এবং লস অ্যাঞ্জেলেস এ পরীক্ষাধীন রয়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ বাজারে ছাড়া হবে বলে আশা ব্যক্ত করেছে এর নির্মাতা ‘Bell’.

Furrion Adonis Yacht: গাড়ি নিয়ে আলোচনা করলেও এই ইয়ট নিয়ে কথা না বললেই নয়। ৭৮ ফিট লম্বা বিলাসবহুল এই স্মার্ট ইয়টে রয়েছে ‘Angel’ নামক ভয়েস অ্যাক্টিভেটেড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, যে ইয়টের সমস্ত বৈদ্যুতিক কাজকর্ম, বিনোদন, রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি, ইয়টের বায়োমেট্রিক নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত ক্যামেরা সিস্টেম এবং অন্যান্য অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। সম্পূর্ণ ইয়টজুড়ে রয়েছে ইন্টারঅ্যাকটিভ মিরর ডিসপ্লে, Furrion এর নিজস্ব সফটওয়্যার সমৃদ্ধ টেলিভিশন ও সাউন্ডবার। এই ইয়টের রয়েছে নিজস্ব ড্রোন এবং ড্রোন পোর্ট।

তথ্য সূত্রঃ ATCTOTO

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *